কুড়িগ্রামের রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরণের পটপরিবর্তন
আনোয়ার সাঈদ তিতু,
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
কুড়িগ্রামের রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরণের পালাবদলের সাক্ষী হলো এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে উত্তরাঞ্চলের এই জেলায়। এবার জেলার চারটির মধ্যে তিনটি আসনেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র দাঁড়িপাল্লা এবং একটিতে তাদের শরিক জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি।
অতীতে কুড়িগ্রাম ১, ২ ও ৩ আসন দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হতো। স্থানীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং ব্যক্তিনির্ভর ভোটব্যাংক ছিল তাদের মূল ভরসা। এ বারের নির্বাচনে সেই ভিত্তিতে স্পষ্ট ভাঙন দেখা গেছে। ফলাফল প্রকাশের পর পরই স্থানীয়দের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়, এটি কেবল প্রার্থীভিত্তিক পরাজয়, নাকি দলীয় অবস্থানের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন। এবারের নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-১ আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র অধ্যাপক মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯৮ ভোট।
তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের মোঃ সাইফুর রহমান রানা পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৩১৯ ভোট। অথচ এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির (জাপা) দখলে ছিল। জাতীয় পার্টির মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক টানা প্রায় ২৩ বছর সংসদ সদস্য ছিলেন। এ আসনটিতে জাতীয় পার্টির হারের পেছনে দায়ী করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকা, সাধারণ জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা এবং জাপা থেকে তরুণ ভোটারদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। কুড়িগ্রাম-২ আসনে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ।
তিনি শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৩৫ ভোট। এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির পনির উদ্দিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ১৩,৭৩৬ ভোট। এ আসনে বিএনপি প্রার্থীর হারের পেছনে একাধিক বিষয়কে দায়ী করা হচ্ছে। বিএনপির প্রার্থীর বাড়ি সদর উপজেলায় হওয়ায় নির্বাচনে কম জনসংযোগ, জাতীয় পার্টির সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকা, বালুমহালে টোল আদায় এবং বিএনপির তরুণ সমর্থকদের নানা সময়ে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ।
অপরদিকে জাতীয় পার্টির পরাজয়ের পেছনে বড় কারণ দায়ী করা হচ্ছে স্থানীয় সমস্যা সমাধান না করা, জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়া এবং জনগণের সেবক না হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভবান হতে জনপ্রতিনিধি হওয়া। কুড়িগ্রাম-৩ আসনে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র ব্যারিস্টার মোঃ মাহবুবুল আলম সালেহী। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৩৩ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তাসভীর উল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৮,৯৮২ ভোট।
এই আসনটিও দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দখলে থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতা, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা, হিন্দু সম্প্রদায় ও নারীদের কল্যাণে কাজ না করা এবং চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থার উন্নয়ন না করায় জাপার লাঙ্গল প্রতীককে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক।
তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ৮১ হাজার ৬৯৬ ভোট এবং তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আপন বড় ভাই মোঃ আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে ৬৫ হাজার ৬২৪ ভোট পেয়েছেন। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এ আসনটি জামায়াতের দখলে যাওয়ার কারণ হিসেবে মোঃ আজিজুর রহমানের চেয়ে তাঁর ছোট ভাইয়ের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিগত সুনামকে কারণ হিসেবে দেখছেন সাধারণ ভোটাররা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের জয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন মজবুত করা, তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মাঠকেন্দ্রিক সমন্বিত প্রচারণা– এ তিন বিষয়কে ১১ দলীয় জোটের সাফল্যের প্রধান কারণ।