রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা নিয়ে নাটক
ডিডি - ডেস্ক রিপোর্ট
প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) যে নাটকীয়তা দেখা যায়, এবারও তার আলামত মিলছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে দলটির অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের চলমান বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ করে একটি ‘ভুয়া বিজ্ঞপ্তি’।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ভারত সফরে থাকা জি এম কাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে রওশন নিজেকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। মূলধারার গণমাধ্যমেও এ খবর প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে রওশনের বক্তব্য জানা না গেলেও তাঁর রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ সমকালকে বলেছেন, ‘বিভ্রান্তি ছড়াতে বিজ্ঞপ্তি ছড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে রওশন এরশাদের সম্পর্ক নেই।’
কথিত বিজ্ঞপ্তিতে রওশনের সই আছে। জাপা সূত্র জানিয়েছে, বিরোধীদলীয় নেতার দুই অনুসারী বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়েছেন। গত শনিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রওশন। তাঁর অনুসারীরা একে কাজে লাগিয়ে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন সরকারের সমর্থনে রওশন চেয়ারম্যান হয়েছেন।
জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বিবৃতি এবং ভিডিও বার্তায় বিজ্ঞপ্তিটিকে ভুয়া আখ্যা দেন। তবে গত বছর দল থেকে বহিষ্কার হওয়া মসিউর রহমান রাঙ্গা দাবি করেন, রওশন এরশাদই দলের চেয়ারম্যান। জি এম কাদেরের অনুসারীরা মানতে না চাইলে রাস্তায় আন্দোলন করতে পারেন।
কথিত বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে গত ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী জুড়ে দেওয়া হয়। তাতে লেখা আছে, জাপা চেয়ারম্যান পদ দিয়ে মামলার কারণে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দলের চারজন কো-চেয়ারম্যান ‘ক্রান্তিকাল’ অতিক্রমে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তবে ওই কার্যবিবরণীতে রওশনের স্বাক্ষর নিয়ে তারিখ দেওয়া হয়েছে ২২ আগস্ট, ২০২৩।
এতে চার কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ও সালমা ইসলামের সই রয়েছে। আবু হোসেন বাবলা ভিডিও বার্তায় জানান, জি এম কাদেরই জাপার চেয়ারম্যান। দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ সম্মানিত ব্যক্তি। তবে তাঁকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
রুহুল আমিন হাওলাদার সমকালকে বলেন, গত কয়েক দিনে রওশন এরশাদের সঙ্গে দেখা, কথা কিছুই হয়নি। আর কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানেন না রওশন এরশাদও। তাঁর নাম ব্যবহার করে জি এম কাদেরকে অপসারণের গুজব ছড়ানো হয়েছে।
জাপা নেতাদের বক্তব্য সামনে আসার পর চুপসে যান রওশনপন্থিরা। এর আগে দুপুরে ছড়ানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমি বেগম রওশন এরশাদ, এমপি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান এই মর্মে ঘোষণা করছি যে, পার্টির সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে ও সিদ্ধান্তক্রমে দলের গতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।’
কাজী লুৎফুল কবীর নামে এক ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপে এই ‘বিজ্ঞপ্তি’ দেন। তিনি অনেক দিন ধরেই রওশনসহ তাঁর অনুসারী নেতাদের বিবৃতি সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়ে আসছেন। গোলাম মসীহ সমকালকে জানান, লুৎফুল কবীর বিরোধীদলীয় নেতার প্রেস উইংয়ের সদস্য নন।
হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া বিজ্ঞপ্তির উৎস সম্পর্কে লুৎফুল কবীরের দাবি, সাংবাদিক হিসেবে তিনি তা দিয়েছেন। রওশন তাঁকে এই বিজ্ঞপ্তিতে পাঠাতে বলেছেন কিনা– প্রশ্নে দাবি করেন, বিরোধীদলীয় নেতার মুখপাত্র কাজী মামুনুর রশিদ দিয়েছেন।
জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন কাজী মামুন। জি এম কাদের জামানায় দল থেকে বাদ পড়ে রওশনের সঙ্গে যোগ দেন। গত শনিবার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে গণভবনেও যান। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহও সেই বৈঠকে ছিলেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে রওশনের সম্পর্ক নেই। নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণার প্রশ্নই আসে না। আমাদেরই (রওশনপন্থি) কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়েছে। অন্তর্ঘাত সৃষ্টির জন্য কেউ তা করে থাকতে পারে।’ এ বিষয়ে কাজী মামুনের বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।
গত ডিসেম্বরে রওশনের অনুসারীরা তাঁকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে ঘণ্টাখানেক পর তা স্থগিত করেন। ২০১৭ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সরিয়ে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছিলেন তাঁর অনুসারীরা। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এরশাদের মৃত্যুর পর একই ঘোষণা দিয়েছিল।
নেতৃত্ব নিয়ে রওশন ও জি এম কাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বহু বছরের। জি এম কাদের বিএনপির সুরে কথা বলছেন– এ অভিযোগ তুলে তাঁকে নেতৃত্ব থেকে সরাতে গত বছরের আগস্টে কাউন্সিল ডাকেন রওশন। পাল্টা হিসেবে তাঁকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরাতে চেষ্টা করেন জি এম কাদের। সরকারের সমর্থনে টিকে যান রওশন। রওশনপন্থিদের মামলায় চার মাস দায়িত্ব পালন করতে পারেননি জি এম কাদের। পরে জানুয়ারিতে ‘সরকারি মধ্যস্থতায়’ তাদের সমঝোতা হলেও তা টেকেনি। আগামী নির্বাচনে জাপা কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে ফের মুখোমুখি হয়েছেন দেবর-ভাবি। রওশন বিদ্যমান ব্যবস্থায় বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। আর সরকারের সমালোচক জি এম কাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সরব হয়েছেন।